Interview

গুণগত ঋণেই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ

Foto : Betty Thomas - banglajibon.com

গুণগত ঋণে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ: সোনালী ব্যাংকের নতুন দিগন্ত

Banglajibon.com – গ ণগত ঋণ ই ব য ক – ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত—সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন। এই প্রেক্ষাপটে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শওকত আলী খান ভবিষ্যতের ব্যাংকিং, গুণগত ঋণের প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যাংকটির সাম্প্রতিক আর্থিক অবস্থান নিয়ে আজকের পত্রিকার মুখোমুখি হয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মৃত্তিকা সাহা।

ব্যাংকিং খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

দেশের ব্যাংকিং খাতের বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ হিসেবে শওকত আলী খান উচ্চ খেলাপি ঋণকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানান, ঋণগ্রহীতার সদিচ্ছার অভাব, দুর্বল ঝুঁকি মূল্যায়ন, অপর্যাপ্ত জামানত এবং ঋণের অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যবহারের প্রবণতা—এই বিষয়গুলো এই সমস্যার পেছনে কাজ করছে।

এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে ব্যাংকগুলোর সুশাসন, স্বচ্ছতা, কার্যকর ঝুঁকি মূল্যায়ন ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের বিকল্প নেই। আমার বিশ্বাস, গুণগত ঋণই ভবিষ্যতের ব্যাংকিংকে আরও নিরাপদ ও টেকসই করবে।

এই লক্ষ্য অর্জনের প্রধান শর্ত হিসেবে তিনি নিয়ম মেনে ঋণ বিতরণ, খেলাপি আদায়ে কঠোরতা এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জনকে উল্লেখ করেছেন। শুধু মুনাফা নয়, দায়িত্বশীল ব্যাংকিংই দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্যাংকের শক্ত ভিত্তি তৈরি করে বলে তিনি মনে করেন।

আর্থিক অর্জন ও মূলধন ঘাটতি কাটানো

বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সব আর্থিক সূচক ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। গত বছর ব্যাংকটি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড মুনাফা অর্জন করেছে। একই সঙ্গে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। তবে মুনাফাই একমাত্র লক্ষ্য নয়; টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতিতে অবদান রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

২০২৫ সালে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা। ২০২৪ সালে প্রায় ৫ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকার ঘাটতি ছিল। এখন তা দূর করে ৮০ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্তে এসেছি।

দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকের অভ্যন্তরে কঠোর সুশাসন, নিয়ম মেনে কর্মকাণ্ড পরিচালনা, খেলাপি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং বড় ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিবর্তে গুণগত ঋণে জোর দেওয়ার ফলেই এই সাফল্য এসেছে। পাশাপাশি কৃষি ও সিএমএসএমই খাতে লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও তারল্য পরিস্থিতি

সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৮ শতাংশ থেকে প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি বছর এটি ১২ শতাংশের নিচে এবং আগামী বছর এক অঙ্কে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। গত বছর খেলাপি ঋণ থেকে ১ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে, যা আগের বছরের প্রায় দ্বিগুণ।

আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে খেলাপি নিয়ন্ত্রণ, সতর্ক ঋণ বিতরণ এবং আদায় কার্যক্রম জোরদারের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে। চলতি বছর বাফার মূলধন ১২ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আমানত ও তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে শওকত আলী খান জানান, মূল্যস্ফীতি মানুষের সঞ্চয়ে প্রভাব ফেলেছে এবং কিছু ব্যাংকের প্রতি আস্থার সংকটও রয়েছে। ফলে কোথাও অতিরিক্ত তারল্য, কোথাও সংকট দেখা দিয়েছে। তবে গ্রাহকের আস্থাই ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ২০২৪ সালে তাদের আমানত বেড়ে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬২১ কোটি টাকার পৌঁছেছে, যা গ্রাহকের আস্থারই প্রতিফলন।

ঋণ বিতরণ নীতি ও ডিজিটাল উন্নয়ন

বর্তমানে সোনালী ব্যাংক সিএমএসএমই, রপ্তানিমুখী এসএমই, কৃষি ও মাইক্রো ক্রেডিট খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এসব খাত উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। বর্তমানে শুধু সিএমএসএমই খাতেই তাদের ঋণ ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বড় ঋণ বন্ধ নয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিবর্তে নিরাপদ, উৎপাদনশীল ও গুণগত ঋণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিটি ঋণ এখন ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই দেওয়া হচ্ছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে ব্যাংকটি উল্লেখযোগ্য এগিয়েছে। করপোরেট আই-ব্যাংকিং, ‘সোনালী ই-সেবা’ ও ‘সোনালী ই-ওয়ালেট’-এর মাধ্যমে হিসাব খোলা, আন্তব্যাংক লেনদেন, বিল পরিশোধ, কিউআরভিত্তিক নগদ উত্তোলনসহ বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল করা হয়েছে। কল সেন্টারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক গ্রাহকসেবাও নিশ্চিত করা হচ্ছে।

সর্বজনীন বাংলা কিউআর নিয়ে শওকত আলী খান বলেন, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মোহনযোগ্য উদ্যোগ। একক কিউআর ব্যবস্থা লেনদেনকে সহজ, দ্রুত ও কম খরচের করবে। তবে এর সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং গ্রাহকের সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।

আগামী দিনের অগ্রাধিকার

আগামী দিনের অগ্রাধিকার হিসেবে শওকত আলী খান খেলাপি ঋণ আরও কমানো, গুণগত ঋণ বৃদ্ধি, আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণকে উল্লেখ করেছেন।

Leave a Comment