Analysis

মার্কিন হামলা সাময়িক বন্ধের পরও ইরান কেন নিজেই যুদ্ধ বাড়াচ্ছে

Foto : Betty Thomas - banglajibon.com

ইরানের নতুন কৌশল: সামরিক বিরতি সত্ত্বেও হামলা

Banglajibon.com – ম র ক ন হ মল স – মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দিনের আপেক্ষিক শান্তির অবসান ঘটিয়েছে মার্কিন হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক আক্রমণ ইরান যুদ্ধের গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আগে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরান পাল্টা জবাব দিত। কিন্তু এবার তেহরান নিজেই আবার যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধ কোন দিকে যাবে তা নিজেদের শর্তে প্রভাবিত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারে ইরানের আগ্রহ বাড়ছে।

ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বুধবার সকালে ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমরা তাদের চৌদ্দগুণ উদ্ধার করে দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর কঠোর হামলা চালাব। তারা মার খাবে।’ এমন হুমকি যে দেওয়া হতে পারে, তা ইরানের কাছে নিশ্চয়ই অজানা ছিল না। কারণ, তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সময় জানত, এর ফলে আবারও মার্কিন হামলা চালাতে পারে। গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির মতো যে বিরতি তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প তার জন্য ইরানকেই কৃতিত্ব দিয়েছিলেন।

ইরানের অবস্থানে মৌলিক কিছু পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে, তারা যদি মনে করে কোনো পরিস্থিতিতে হামলা শুরু করাই একমাত্র কার্যকর পথ, তাহলে নিজেরাই প্রথমে হামলা চালাতে এখন বেশি আগ্রহী। — হামিদরেজা আজিজি, জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স

প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মতোই সংযত থাকার ইঙ্গিত দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। অর্থাৎ, ইরান সম্ভবত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে—যুদ্ধের মধ্যে নিজ ভূখণ্ডে রাতভর চলা বোমাবর্ষণ আবার শুরু হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও চাপ বাড়ানোই এখন বেশি জরুরি। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদরেজা আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরানের অবস্থানে মৌলিক কিছু পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে, তারা যদি মনে করে কোনো পরিস্থিতিতে হামলা শুরু করাই একমাত্র কার্যকর পথ, তাহলে নিজেরাই প্রথমে হামলা চালাতে এখন বেশি আগ্রহী।’ ইরানের এই হামলার কিছুক্ষণ আগেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।

আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব

জর্ডানে হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে ইরাকে হামলা চালায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকে চালানো এই অভিযানকে জর্ডানে হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে বর্ণনা করেনি। তাদের দাবি, এর আগের ৭২ ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ৩০ টির বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। ওই হামলার জবাব হিসেবেই ইরাকে অভিযান চালানো হয়েছে। রাতভর চলা এই উত্তেজনা দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ কীভাবে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চেয়েছে। কিন্তু এখন দেশটি ক্রমেই সংঘাতের গভীরে জড়িয়ে পড়ছে।

জর্ডানে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি তেহরানের অবস্থান সম্ভবত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরান আপাতত হামলা বন্ধ করেছিল ঠিকই, কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি যদি চ্যালেঞ্জ করা হয়, তাহলে আবারও যুদ্ধ শুরু করতে তারা এক মুহূর্তও দ্বিধা করবে না। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হরমুজ প্রণালি যদি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যায়, তাহলে তেহরান নিজেদের বিজয়ী মনে করতে পারবে না। তাঁর মতে, এই জলপথ এখন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং এটি দেশের একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক হাতিয়ার’ হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment