ভারতে নতুন রাজনৈতিক ঝড়: অনলাইন থেকে উঠে আসা জনআন্দোলন
Banglajibon.com – ভ রত জ ন জ ব ক – ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে ভারতে শুরু হওয়া আন্দোলন দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতি কমে যাওয়ার ক্ষোভ এই আন্দোলনের পেছনে কাজ করছে। সিএনবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু হওয়া সিজেপি এখন একটি শক্তিশালী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন
গত ৬ জুন এই আন্দোলন শুরু হয় দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে। গত মে মাসে একাধিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রীকে দায়ী করছেন। তবে আন্দোলন তীব্র হয় গত সোমবার পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পর। সেদিন পার্লামেন্টের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে ফেললে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে এবং লাঠিপেটা করে।
দিল্লি পুলিশের দাবি, দুই পক্ষের সংঘাতে তাদের শতাধিক সদস্য আহত হয়েছেন।
তবে এক আন্দোলনকারীর অভিযোগ, ছত্রভঙ্গ করার বদলে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। এ বিষয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিএনবিসির মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
সিজেপি গঠনের পটভূমি
সিজেপি গঠন হয় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক বক্তব্যকে ঘিরে। এক শুনানিতে তিনি বলেন, দেশকে বিভিন্নভাবে অস্থিতিশীল করতে চাওয়া একদল ‘পরজীবী’ আছে আর তাদের সঙ্গে কিছু বেকার তরুণও যুক্ত হয়েছেন। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর মৌখিক মন্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সূর্য কান্তের ওই বক্তব্যের পর গত ১৬ মে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সিজেপি গঠন করেন। এর পর থেকেই ‘ককরোচ’ শব্দটি ঘিরে গড়ে ওঠা সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সংগঠনটির অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর সমর্থন ও পুলিশের বলপ্রয়োগ
কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে বিরোধী দলগুলো। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগের জবাবদিহির দাবিতে রাহুল গান্ধীসহ অনেক নেতা-কর্মী মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন। গত মঙ্গলবার রাহুল গান্ধীকে আটক করা হয়। কয়েক ঘণ্টা পর অবশ্য তাঁকে ছেড়েও দেওয়া হয়।
গত মে মাসে মেডিকেলের ভর্তির গুরুত্বপূর্ণ নিট পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বাতিল করা হয়। এতে লাখো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরে জুনে পুনরাবৃত্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। গত বুধবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের সব যৌক্তিক উদ্বেগের সমাধানে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এতে আন্দোলনের তীব্রতা কমছে না।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতামত
সিজেপির দাবি, আন্দোলন ইতিমধ্যে ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো দেশের স্থিতিশীলতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের সর্বশেষ ‘সিভিল আনরেস্ট ইনডেক্সে’ ভারতকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এশিয়া গবেষণা বিভাগের প্রধান রিমা ভট্টাচার্য বলেন, টানা এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর দুর্বল কর্মসংস্থানের দাবি আর অতীতের ওপর চাপানো কঠিন। ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে এটি মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী জন-অসন্তোষের ভিত্তি তৈরি করছে।
এদিকে সিজেপির আন্দোলনে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও কৃষক সংগঠনও সমর্থন দিয়েছে। কৃষকনেতা রাকেশ টিকাইত প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরেশিয়া গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া প্রধান প্রমিত পাল চৌধুরী মনে করেন, সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকা প্রায় সব গোষ্ঠী এই আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। এটি দ্রুত বিস্তৃত হলেও একই সঙ্গে আন্দোলনটি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠার ঝুঁকিও বাড়ছে।

