গাজার তাঁবু শিবিরে সিগারেট জ্বালানোর লাইটারই এখন জীবনরেখা
Banglajibon.com – গ জ র ত ব শ ব – গাজার দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ তাঁবু শিবিরগুলোতে সিগারেট জ্বালানোর সাধারণ একটি ডিসপোজিবল লাইটারই এখন হয়ে উঠেছে দুর্লভ ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এক পণ্য। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে—খাবার, পানি ও জ্বালানির মতোই দৈনন্দিন জীবন টিকিয়ে রাখতে লাইটারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে গাজার বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে।
দাম বৃদ্ধি ও সংকটের চিত্র
যুদ্ধের আগে গাজার তিনটি লাইটারের দাম ছিল মাত্র এক শেকেল (প্রায় ৪০ টাকা)। এখন সেখানে একটি লাইটার কিনতেই খরচ হচ্ছে ১০০ শেকেল, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৪ হাজার টাকারও বেশি! এই বিপুল দাম নিসরিনের মতো বাস্তুচ্যুত মানুষের নাগালের বাইরে। লাইটারের সংকটে একটি লাইটারই এখন কয়েক ডজন পরিবারের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে ঘুরতে ঘুরতে অতিরিক্ত ব্যবহারে সেগুলো দ্রুত নষ্টও হয়ে যাচ্ছে।
লাইটার ছাড়া অসম্ভব জীবন
চার সন্তানের মা নিসরিন আবু সাদার কথাই ধরুন। রান্নার জন্য আগুন জ্বালানো এখন তাঁর কাছে বড় এক চ্যালেঞ্জ। গাজায় রান্নার গ্যাসের সংকট থাকায় বহু পরিবারকে কার্ডবোর্ড, প্লাস্টিক ও কাঠের টুকরোসহ যা কিছু জ্বালানো যায়, তা দিয়েই খাবার রান্না করতে হচ্ছে।
লাইটার ছাড়া তাঁবু কোনো কাজে আসে না। গ্যাস নেই। আমরা ২৪ ঘণ্টাই আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করি। তাই তাঁবুতে একটি লাইটার খুবই জরুরি।
খান ইউনিসে নিজের তাঁবুর পাশে অস্থায়ী রান্নার জায়গায় বসে ৩৮ বছর বয়সী নিসরিন এই কথাগুলো বলেন। আগুন জ্বালানোর প্রয়োজন হলে তিনি অপেক্ষা করেন অন্য কেউ আগুন জ্বালানো পর্যন্ত। অথবা যেখানে আগুন জ্বলছে সেখানে গিয়ে এক টুকরো কার্ডবোর্ডে আগুন ধরিয়ে সেটি নিয়ে তাঁবুতে ফিরে আসেন।
নতুন জীবিকার সূচনা
লাইটারের এই সংকট নতুন একটি জীবিকারও জন্ম দিয়েছে। বাস্তুচ্যুত তিন সন্তানের বাবা হাসান আবু লতিফা এখন নষ্ট লাইটার মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যুদ্ধের আগে তিনি কৃষি প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন।
লাইটার মেরামত করা আসলে কোনো পেশা নয়। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ, লাইটারের প্রয়োজন এবং নিজেদের কাজের প্রয়োজন—সব মিলিয়ে আমরা বাধ্য হয়েই এটি শুরু করেছি।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রতিরোধ
গাজার অর্থনীতি যুদ্ধের কারণে প্রায় সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বেকারত্ব ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং দারিদ্র্য প্রায় শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সংঘাতের কারণে অধিকাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে এবং ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে অবকাঠামো।
বাস্তুচ্যুত ছয় সন্তানের মা ইফতিখার আল-কাফারনা ঐতিহ্যবাহী চুলায় রুটি বানিয়ে জীবিকা চালান। তাঁর কাছেও লাইটার এখন কাজের অপরিহার্য উপকরণ। তিনি বলেন, ‘লাইটার থাকলে কাজ আছে। লাইটার না থাকলে কাজও বন্ধ। তখন তিন-চার ঘণ্টা বসে থাকতে হয়।’ গাজায় চলমান সংকটের এই চিত্র দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ কীভাবে মানুষের জীবনে সবচেয়ে সাধারণ ও তুচ্ছ জিনিসকেও বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপকরণে পরিণত করতে পারে।

