রক্তাক্ত হাতে কাজ করে উপকূলীয় নারী শ্রমিকদের দাবি ও সংগ্রাম
Banglajibon.com – রক ত ক ত হ ত ন – মাছের মাথা কাটতে কাটতে হাত থেকে রক্ত ঝরে পড়ে, কিন্তু নিজের খাওয়ার সময় ভাত মুখে তোলার অবস্থা থাকে না। এমনই এক কঠিন জীবনযাপন করছেন বাগেরহাটের নারী শ্রমিক শিউলি বেগম। তিনি বলেন, রক্তাক্ত হাত নিয়েই পরদিন আবার কাজে যেতে হয়, না গেলে সংসার চলবে কীভাবে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপে তিনি এই দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।
যখন গোনে কাজ করি, মাছের মাথা কাটতি কাটতি হাত এমনভাবে ছিলি যায যে রক্ত ঝরতি থাকে। বাইতে গেয়ে যখন খেতি বসি, নিজের হাতে ভাত মাইখে খাওওয়ার অবস্থা থাকে না।
মাতৃত্বকালীন সুবিধাহীন জীবনযাত্রা
শিউলি বেগম জানান, তিনি আগে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর কোনো ধরনের মাতৃত্বকালীন সুবিধা না পাওয়ায় স্থায়ী চাকরি ছেড়ে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি কখনো মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায়, আবার কখনো কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
সংলাপের আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ক্রিশ্চিয়ান এইডের’ সহযোগিতায় ‘কর্মজীবী নারী’। শিউলি বলেন, কোম্পানি থাকলে শ্রমিকদেরও কাজের সুযোগ থাকে। তাই কোম্পানির বিরুদ্ধে নয়, বরং কোম্পানির স্বার্থরক্ষা করে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তাঁর।
শ্রমিকদের অসংখ্য সমস্যা
সংলাপে মৎস্য খাতের নারী শ্রমিকরা জানান, কারখানার বরফের মধ্যে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় গ্লাভস দেওয়া হয় না। নিজেদের টাকায় গ্লাভস, অ্যাপ্রোন, গামবুটসহ অন্য সরঞ্জাম কিনতে হয়। হাতে ক্ষত হলে চিকিৎসার খরচও শ্রমিকদের নিজেদেরই বহন করতে হয়।
আমরা স্থায়ী শ্রমিক হলেও আজ পর্যন্ত নিয়োগপত্র পাইনি। আমি জানি না আমার কতদিন ছুটি আছে, আমি কখন ছুটি নিতে পারব। আমার বেতন ৭০০০ টাকা, ঈদ আসলে বোনাসটাও পুরোপুরি পাই না।
আরেক শ্রমিক কোহিনূর বেগম এই কথাগুলো তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্থায়ী শ্রমিক হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত নিয়োগপত্র পাননি। বেতন ৭০০০ টাকা হলেও ঈদে বোনাস পুরোপুরি পান না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশ
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন কর্মজীবী নারীর সাধারণ সম্পাদক শারমিন কবীর। প্রধান অতিথি ছিলেন কর্মজীবী নারীর উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। তিনি বলেন, বদলে যাওয়া পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণ।
সুলতান উদ্দিন আরও জানান, যখন মৎস্য আহরণ বন্ধ থাকবে, তখন এই খাতের সঙ্গে জড়িত সবার জন্য কর্মহীন সময়ে কার্ডের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেটির মাধ্যমে যেন তারা কর্মহীন সময়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এ খাতের শ্রমিকদের জন্য শ্রম সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে বিশেষভাবে সুপারিশ করা হয়েছে।
শ্রমবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, গবেষণা থেকে উঠে এসেছে শ্রমিকরা আসলে নিরাপদ এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান চান। সেটি নেই বলেই তারা নানা ধরনের অনিরাপদ কাজে যুক্ত হচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা একটি প্ল্যাটফর্ম করতে পারে, যেন শ্রমিকরা সহজে সেবার সুযোগ পান।
শিল্পের অবনতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি এস হুমায়ুন কবির বলেন, আগে ফ্রোজেন ফুড খাতের ১৬২টি ফ্যাক্টরি ছিল। তবে এখন ২০-২২টি ফ্যাক্টরি চালু আছে। চিংড়িতে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী যে বিদেশি দ্রব্য পুশ করে, সেটি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
তিনি উপকূলীয় নারীদের উন্নয়নে শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবহন, জলবায়ু-সহনশীল কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা, সমান মজুরি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নেতৃত্ব বিকাশ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন।
সংলাপে মৎস্যশিল্প খাতসংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা মৃতপ্রাণ মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে শ্রমিকের স্বার্থে এবং দেশের প্রয়োজনে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানান। এই খাতের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কাজ করার সংকল্পের কথা জানান তারা।

