মানব পাচারের ফাঁদে পড়ে প্রবাসে প্রাণ হারালেন গাড়িচালক শাহাদৎ
Banglajibon.com – ধ নট ম নব প চ রক – বগুড়ার ধুনট উপজেলার চিকাশি ইউনিয়নের ছোনপচা গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর জামাল উদ্দীনের ছেলে শাহাদৎ হোসেন (৩৫) নামের এক যুবক প্রবাসে প্রাণ হারিয়েছেন। স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মাকে নিয়ে সুখী সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। নানাবিধ আত্মীয়ের পরিচয় দিয়ে মাহামুদুল সরকারের মাধ্যমে গাড়িচালকের কাজের জন্য পাঁচ লাখ টাকার চুক্তিতে সৌদি আরবে যান শাহাদৎ। সেখানে কাজ না পেয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাঁর প্রাণ চলে গেছে।
চুক্তি ভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের কান্তনগর নয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মাহামুদুল সরকারের মাধ্যমে গত ১ জানুয়ারি শাহাদৎ সৌদি আরবে যান। দিনমজুর বাবা জামাল উদ্দীন গোয়ালের গরু-ছাগল বিক্রি ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠান। কিন্তু শাহাদৎকে চুক্তি মোতাবেক গাড়িচালকের কাজ না দিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করা হয়।
কাজ না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গত ১৯ জুন রাতে মাহামুদুল সরকারের বাড়িতে যান শাহাদতের মা শাহনাজ বেগম ও নানি শাহেদা বেওয়া। এই সময় মাহামুদুল সরকার ও তাঁর সহযোগী আরিফুলের সঙ্গে শাহনাজ বেগমের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁদের মারধর করেন আরিফুলরা। এই ঘটনার গত ২১ জুন শাহনাজ বেগম বাদী হয়ে মাহামুদুল সরকার ও শেরপুর উপজেলার ঝাঁজর গ্রামের বাসিন্দা আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ধুনট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
পুলিশ কর্মকর্তার অনৈতিক প্রস্তাব ও মামলা রুজু
অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমানকে। এই সুযোগে ওই পুলিশ কর্মকর্তা শাহাদতের স্ত্রী কাজলীকে মোবাইল ফোনে অনৈতিক কাজের প্রস্তাব দেন। পরে কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানাজানির পর এসআই মোস্তাফিজুরকে ১২ জুলাই প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। এরপর ১৪ জুলাই রাতে ওই দুই মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি মামলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এলাকা ছেড়ে পলাতক রয়েছেন।
প্রবাসে মৃত্যুর খবর ও পরিবারের কান্না
এরই মধ্যে গত শনিবার বগুড়ার প্রবাসীকল্যাণ সেন্টারের উপশহরীয় ওয়েজ অর্নাস কল্যাণ বোর্ড ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান থেকে এক চিঠিতে জানানো হয়, শাহাদৎ মারা গেছেন। ১১ জুলাই শাহাদতের মরদেহ সৌদি আরবের আল মানার স্টেশনের পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে রেখেছে।
আমাদের সব সম্বল শেষ করে চাকরির জন্য ছেলেকে মাহামুদুলের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে ছেলে মারা যাবে, তা আমাদের জানা ছিল না। এখন ছেলের লাশ কীভাবে আনব, তা-ও বলতে পারছি না।
আজ সোমবার সকালে নিহত শাহাদতের বাড়ি গেলে তাঁর বাবা-মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই কথাগুলো বলেন। শাহাদতের বাবা-মায়ের দাবি—দুই মানব পাচারকারী তাঁদের ছেলেকে চাকরি না দিয়ে সৌদি আরবে কৌশলে হত্যা করেছেন। ছেলের হত্যাকারীদের বিচার চান তাঁরা। সে সঙ্গে সন্তানের মরদেহ দেশে ফেরত আনার দাবি জানান।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও পুলিশের তদন্ত
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মাহামুদুল সরকারের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, শাহাদৎকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ভিসা জটিলতা ছিল। কথা বলে সমস্যার সমাধান করে দিতে চেয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে।
ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বলেন, দুই মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। শাহাদতের মরদেহ দেশে আনার জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

