দ ড় ঘণ ট ল ক য় – জাহিদের শেষ যাত্রা
Banglajibon.com – দ ড় ঘণ ট ল ক য় – মহাখালী রেলগেট এলাকার রাস্তার পাশে অস্থায়ী একটি ফুলের দোকান চালাতেন ১৮ বছরের জাহিদ হোসেন। চব্বিশের উত্তাল জুলাইয়ে ১৯ তারিখের সেই ভয়ানক দিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন। বাবা-মায়ের অভিযোগ, মৃত্যুর পর তাঁর লাশ প্রায় দেড় ঘণ ট ল ক য় এক গলি থেইকা আরেক গলিতে লুকাইয়া রাখতে হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময় ধরে লাশ নিয়ে যে কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে পরিবার, তা এখনো ভুলতে পারেন না রাহেলা বেগম ও জাহাঙ্গীর আলম।
শেষ আবদার ও বের হওয়ার সিদ্ধান্ত
জাহিদ সেদিন মায়ের কোলে শুয়ে বলেছিলেন, ‘আম্মু, মাথাটা একটু আঁচড়াইয়া দিবা?’ রাহেলা বেগম এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না, সেটাই ছিল ছেলের শেষ আবদার। বাবাও পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু ছেলে বারণ শোনেননি। নিচে নেমেই বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় চলে যান। রাহেলা বেগম জানান, একবার এসে বাসা থেকে একটা হেলমেট নিয়ে গিয়েছিলেন ছেলে। সম্ভবত মাথায় গুলি লাগবে না এই আশায়।
বাসায় আইসা কইলাম, ‘বাবা, আজকে গুলির অর্ডার আছে শুনছি। আজকে বাইরে যাইয়ো না।’ ও কইল, ‘ঠিক আছে আম্মু, যামু না।’ কিন্তু আমার ভিতরটা কেমন জানি কাঁপতেছিল। মনে হইতেছিল, আজকে কিছু একটা হইব।
হাসপাতালে না পৌঁছানো জাহিদ
মহাখালীর বাসা থেকে বের হওয়ার ঘণ্টাখানেক পরই একটা গুলি এসে লাগে জাহিদের মাথার পেছনে। তিনি তখন ছিলেন রেলক্রসিং এলাকায় আরজতপাড়ার প্রবেশমুখে। গুলিবিদ্ধ হয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন জাহিদ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জাহাঙ্গীর আলমের ধারণা, মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে কোনো স্নাইপার গুলি করেছিল জাহিদকে। ঘটনাস্থলের দুই মিনিটের দূরেই ইউনিভার্সাল হাসপাতাল। কিন্তু সে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পাননি জাহিদ।
বাবা-মায়ের অভিযোগ, মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও মৃত্যু নিশ্চিত করতে মারধর করা হয়েছিল জাহিদকে। রাহেলা বেগম জানান, বন্ধুরা কোনোমতে উদ্ধার করে জাহিদকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের ভয়ে হাসপাতাল তাঁকে রাখতে চায়নি। এরপর শুরু হয় আরেক বিভীষিকাময় অধ্যায়। হাসপাতাল থেকে জাহিদের লাশ নিয়ে বের হওয়ার পর তা সরাসরি বাসায় আনা যায়নি।
পুলিশের ভয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা এক গলি থেইকা আরেক গলিতে লুকাইয়া রাখতে হইছে। লাশ কই রাখব, কী করমু—এই অবস্থা।
শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে এলাকার একটি মসজিদে মরদেহের শেষ গোসল করানো হয়। জানাজার আয়োজন করতেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে নাখালপাড়া কবরস্থানে জাহিদকে দাফন করা হয়। শেষবারের মতো ছেলেকে একটু ছুঁয়ে দেখারও সুযোগ পাননি মা রাহেলা। জাহাঙ্গীর আলম জানান, ছেলের মৃত্যুর পরও তাঁর পরিবারের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। জাহিদের বন্ধুদের অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বড় ছেলে রাহাত হোসেনের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালায়।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জাহাঙ্গীর আলম আর রাহেলা বেগমের সময় যেন সেই দিনটাতেই থেমে আছে। ছেলের মৃত্যুর পর তাঁরা বাসা বদলেছেন। কিন্তু ঘরের প্রতিটা আসবাবেই যেন লেগে আছে ছেলের স্মৃতি। রাহেলা বেগম বলেন, ‘বাইরে যাওয়ার সময় ও কইত, “আম্মু, ১০ টাকা দেন বা ২০ টাকা দেন।” এখন তো ওই ডাকটা নাই।’ জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাঁর বড় ছেলে রাহাত হোসেন উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয়নি।
পরিবারকে সহায়তা করতে বাস কাউন্টারে চাকরি নিয়েছেন তিনি। জাহিদের পরিবারের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। এ পর্যন্তই। শহীদ পরিবারের জন্য ফ্ল্যাটের যে ঘোষণা হয়েছে, সে ব্যাপারেও কোনো কিছু জানেন না তাঁরা। রাহেলা বেগমের চাওয়া, সরকার তাঁদের খবর নিক। জাহিদ হত্যার বিচার হোক। তিনি বলেন, ‘সন্তান তো আর ফিরা পামু না। অন্তত সরকার শহীদ পরিবারগুলার খবর নেক। পরিবারের লোকের জন্য ভালো চাকরির ব্যবস্থা করুক। আর বিচারটা করুক। দুই বছর ধইরা শুধু শুনতেছি বিচার হইব। কিন্তু বিচার তো এখনো হইল না।’

