Bangladesh

আদালতে মামলা: ঋণ শোধে কিডনি বিক্রি, পেলেন ৫০ হাজার টাকা

Foto : James Anderson - banglajibon.com

ঋণের বোঝা কাটাতে কিডনি বিক্রি, কিন্তু পেলেন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা

Banglajibon.com – আদ লত ম মল – গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিঞা এক অদৃষ্ট পরিবর্তনের আশায় তাঁর শরীরের একটি অঙ্গ বিক্রি করেছিলেন। ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী তাঁর কিডনির মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল দশ লাখ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি হাতে পান মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা।

মন্টু মিঞা জানান, দালালরা প্রথমে অগ্রিম পাঁচ হাজার টাকা তাঁর হাতে তুলে দেয়। এরপর তাঁকে ভারত হয়ে নেপালে পাঠানো হয়। সেখানে একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর কিডনিটি বের করে নেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার শেষে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও দালাল চক্রের আচরণ বদলে যায়। প্রতিশ্রুত বাকি টাকা চাইতে গেলে তারা উল্টো তাঁকে ভয় দেখাতে শুরু করে।

দালালেরা মোটে ৫০ হাজার টাকা হাতে দিয়ে আমার শরীরের অঙ্গ কেটে নিয়ে নেপাল থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে কেটে পড়ল। এখন আমি না পারি খাটতে, না পারি পরিবারটাকে খাওয়াতে। আমার শরীরের অঙ্গও গেল, অভাবও মিটল না; আমি এখন পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছি।

সংসারের খরচ মেটাতে স্থানীয় এনজিও ও মহাজনদের কাছ থেকে তিনি বারবার ঋণ নিয়েছিলেন। দিন এনে দিন খাওয়া দিনমজুর হিসেবে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ঋণের চাপে যখন তিনি দিশেহারা, তখনই স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ অঙ্গ পাচারকারী চক্র তাঁর ওপর নজর দেয়। ঢাকার এক ধনী নারীর কিডনি জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়ে তারা তাকে দশ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয়।

অস্ত্রোপচারের পর মন্টু মিঞা এখন মারাত্মক শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। সামান্য কাজ করতে গেলেই তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে তিনি এখন বিছানায় শুয়ে আছেন। এর ফলে পুরো পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

আদালতে মামলা দায়ের

প্রতারণার শিকার হয়ে মন্টু মিঞা জয়পুরহাট আমলি আদালত-৫-এ ১৩ জুন একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ছয়জনকে নাম উল্লেখ করে আরও তিন-চারজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। পরদিন ১৪ জুন জয়পুরহাট আদালতের নির্দেশে কালাই থানায় মামলাটি এফআইআর (নং-১৪) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন: বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, উদয়পুর ইউনিয়নের লওনা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী।

আদালতের নির্দেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের আওতায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধ। অপরাধীদের চিহ্নিত করতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

জয়পুরহাট জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. উজ্জ্বল হোসেন মন্তব্য করেন, মানুষের অসহায়ত্ব ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অঙ্গ পাচার একটি জঘন্য অপরাধ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এমন মানবিক বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হবে।

বর্তমানে জয়পুরহাট আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এই নিঃস্ব ভুক্তভোগী। পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।

Leave a Comment