সেই ১০ শ্রমিকের স্বজনদের কান্না এখনো থামেনি
Table of Contents
সীতাকুণ্ডে প্রাণহানির এক মাস পরও স্বজনদের শোক কাটেনি
Banglajibon.com – স ই ১০ শ রম ক র – চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী উপকূলে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটার এক মাস পেরিয়েছে। সময় গড়ালেও নিহতদের পরিবারের জীবনে স্বাভাবিকতা ফেরেনি। সন্তান, স্বামী কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে অনেক স্বজনই এখন শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় আছেন।
দুর্ঘটনার পর কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পরিবেশের ছাড়পত্র নবায়ন না হওয়ায় ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড এখনও চালু হয়নি। এতে নিহত শ্রমিকদের পরিবার যেমন ক্ষতির ভার বহন করছে, তেমনি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তিন শতাধিক শ্রমিক।
ছেলের স্বপ্নের সঙ্গে থেমে গেল আশোকীর অপেক্ষা
নিহত সানি জলদাসের বয়স ছিল ২০ বছর। সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোডসংলগ্ন মির্জানগর জেলেপাড়া এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তিনি। সানির মৃত্যুর পর তাঁর মা আশোকী জলদাসের জীবনে নতুন করে নেমে এসেছে অসহায়তা।
আশোকী জলদাসের নিজের কোনো বসতভিটা নেই। ১১ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে চন্দন ও সানিকে নিয়ে তাঁকে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। গার্মেন্টসে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন তিনি। বড় ছেলে চন্দনও গার্মেন্টসকর্মী। পরিবারের আর্থিক চাপ কমাতে সানি জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ নিতে চেয়েছিলেন।
মায়ের কাছে সানির ইচ্ছার কথা ছিল খুব স্পষ্ট—একদিন জমি কিনে নিজেদের একটি বাড়ি হবে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত বাসস্থানের জীবন থেকে পরিবারকে বের করে আনার সেই স্বপ্নই তাঁকে কাজের দিকে এগিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু নিজের ঘর করার আগেই বিষাক্ত গ্যাসের ঘটনায় প্রাণ হারান সানি। এখন তাঁর মায়ের কাছে সেই স্বপ্ন কেবলই হারিয়ে যাওয়া ছেলের স্মৃতি।
একজন তরুণ উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু শুধু পরিবারের আয়ের পথ সংকুচিত করে না, ভবিষ্যতের পরিকল্পনাগুলোকেও থামিয়ে দেয়। আশোকী জলদাসের পরিবারের ক্ষেত্রেও সানির অনুপস্থিতি এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যা আর্থিক সহায়তায় পুরোপুরি পূরণ হওয়ার নয়।
অনাগত সন্তানকে নিয়ে ভৌমিকার অনিশ্চিত দিন
একই জেলেপাড়ার বাসিন্দা পলাশ জলদাসও ওই দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাঁর স্ত্রী ভৌমিকা জলদাস এখন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আগামী মাসেই সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা। কিন্তু সন্তানের আগমনের অপেক্ষার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে স্বামীহারা জীবনের দুশ্চিন্তা।
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর পলাশ ও ভৌমিকার বিয়ে হয়। ভূমিহীন পলাশ মামাদের ঘরেই সংসার গড়েছিলেন। আগে মাছ ধরে জীবিকা চালালেও কয়েক বছর ধরে প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় তাঁর আয় কমে যায়। এ অবস্থায় চলতি বছর তিনি জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকের কাজ নেন।
দুর্ঘটনার দিন সকালে কাজে বের হওয়ার আগে স্ত্রীর সঙ্গে পলাশের শেষ কথাগুলো ছিল অতি সাধারণ, কিন্তু এখন তা ভৌমিকার কাছে জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি।
আমি কাজে যাচ্ছি, সাবধানে থেকো।
সেদিনের পর আর ঘরে ফেরেননি পলাশ। সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, তার নাম কী হবে, কীভাবে তাকে বড় করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর প্রতিদিন আলোচনা হতো। এখন সেই শিশুকে একা মানুষ করার পথ কী হবে, তা ভেবে দিন কাটছে ভৌমিকার।
পরিবারটি যে ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছে, তার বড় অংশই শেষ হয়ে গেছে সৎকারের খরচে। ফলে সন্তানের জন্ম, চিকিৎসা, খাবার এবং ভবিষ্যতের ব্যয় কীভাবে সামলানো হবে, সেই প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আর্থিক সহায়তা আছে, কিন্তু ক্ষতি অপূরণীয়
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, কোনো আর্থিক সহায়তাই মানুষের জীবনের বিকল্প হতে পারে না। তবে পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যকে হারিয়ে কেউ যেন সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন না হয়, সে লক্ষ্যেই দ্রুত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্যও কারখানা কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
নিহতদের স্বজনদের বাস্তবতা দেখায়, দুর্ঘটনার পর দেওয়া অর্থ তাৎক্ষণিক সংকট সামলাতে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা থেকে যায়। বিশেষ করে যেসব পরিবারে নিজস্ব জমি বা স্থায়ী আয়ের উৎস নেই, তাদের জন্য একজন সদস্যের মৃত্যু পুরো পরিবারকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
স্বজনদের শোকের সঙ্গে তাই এখন জড়িয়ে আছে বাসস্থান, চিকিৎসা, শিশুর ভবিষ্যৎ এবং প্রতিদিনের খাবারের চিন্তা। সানির মায়ের হারিয়ে যাওয়া ঘর তৈরির স্বপ্ন এবং ভৌমিকার অনাগত সন্তানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা—দুটি পরিবারের এই অভিজ্ঞতা দুর্ঘটনার মানবিক ক্ষতির গভীরতাই সামনে আনে।
বন্ধ কারখানায় কর্মহীন শত শত শ্রমিক
দুর্ঘটনার পর থেকেই ভাটিয়ারী উপকূলের ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড বন্ধ আছে। পরিবেশের ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। এক মাস পেরিয়ে গেলেও কারখানার কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়নি।
কারখানা বন্ধ থাকায় তিন শতাধিক শ্রমিক এখন কাজহীন। যাঁদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল এই কর্মস্থল, তাঁদের অনেককেই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির শোকের বাইরে এই দীর্ঘ বন্ধের প্রভাব পড়েছে আরও বহু শ্রমিক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে।
ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের ম্যানেজার মো. ইউসুফ জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। কার্যক্রম চালুর বিষয়ে তাঁরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চিঠির অপেক্ষায় আছেন।
কারখানা খোলা বা বন্ধ থাকার প্রশাসনিক প্রশ্নের বাইরে নিহতদের পরিবারগুলোর কাছে সময়ের হিসাব ভিন্ন। তাঁদের জন্য প্রতিটি দিনই হারানো মানুষের অনুপস্থিতি নিয়ে কাটে। এক মাস পরও সানি ও পলাশের পরিবারের কান্না থামেনি; বরং আগামী দিনের অনিশ্চয়তা সেই শোককে আরও ভারী করে তুলেছে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is স ই ১০ শ রম ক র?
স ই ১০ শ রম ক র is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does স ই ১০ শ রম ক র matter?
স ই ১০ শ রম ক র matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
