নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি: মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা
Banglajibon.com – ন ত যপণ য র ম ল – নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কেন দাম বাড়ছে, তা বুঝতে বিশেষ কোনো পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ এই সমস্যার মূল কারণ সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে। তবুও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানা সত্ত্বেও না জানার ভান করে থাকেন। বেসরকারি সংস্থাগুলো গবেষণা করবে, সংবাদপত্রে বিশ্লেষণ হবে—কিন্তু এর সরাসরি উপকার হবে না সেই সব মানুষদের যারা কম আয় করে।
সিপিডির গবেষণা ও বাজারের বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের আয়োজিত একটি সংলাপে ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা উপস্থাপিত হয়েছে। এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে মূল কারণ হলো ঘাটে-ঘাটে চাঁদাবাজি। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ কেবল খাবার কিনতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে।
এই দামের ব্যবধানের পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ নেই। বরং এটি অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের ফল। এই সমস্যার সাথে পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় সরকারি দলের নেতারাও জড়িত। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, কৃষকপর্যায়ে চাল ক্রয় করা হচ্ছে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায়, কিন্তু খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। একইভাবে প্রতিটি পণ্যই খুচরা বাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ও সমাধানের পথ
বাজারের এই দামের দৌরাত্ম্য সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। তাদের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে। ফলে তারা সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ নিয়ে জীবনধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়িয়েই নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকেও চরম হুমকির মুখে ফেলছে।
এখন কেবল গবেষণা নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। আবার অর্থনীতির দুরবস্থার কথা বলেও এটি সমাধান হবে না। সরকারের সদিচ্ছাই এখন একমাত্র সমাধানের পথ। মধ্যস্বত্বভোগী ও কমিশন এজেন্টদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করতে যা প্রয়োজন, তা অবশ্যই করতে হবে।
উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষক বাজার স্থাপন করে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় কৃষকদের সরাসরি জাতীয় বাজারের সাথে যুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক সরবরাহব্যবস্থার নীতিমালা তৈরি করা জরুরি। সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে কৃষকরা মৌসুমের সময়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করে দেন। এই দুর্বলতার সুযোগ নেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মজুতদারেরা। তাই দেশজুড়ে পর্যাপ্ত হিমাগার নির্মাণ করতে হবে, যাতে কৃষকরা নিজের সুবিধাজনক সময়ে পণ্য বিক্রি করতে পারেন।
একই সঙ্গে কৃষি উপকরণের ওপর বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। কৃত্রিম সংকট তৈরি, অবৈধ মজুতদারি এবং বিভিন্ন স্তরে চাঁদা আদায় বন্ধ করতে হবে। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা কেবল লোকদেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অসাধু সিন্ডিকেট ও অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে।

