দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম পর্যটন খাতের বিস্তার ও সম্ভাবনা
Banglajibon.com – দক ষ ণ এশ য য দ – বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম ভ্রমণকারীদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। এই প্রবণতা শুধু ভ্রমণকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের ব্যয় ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পর্যটন খাত সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক বিশাল সুযোগের মুখোমুখি। তবুও, পর্যটন খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত বিপণন কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পর্যাপ্ত দৃশ্যমানতার অভাবের কারণে এই সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাপী মুসলিম পর্যটন বাজারের প্রসার
সম্প্রতি ‘ট্রাভেল ডায়ালগস সাউথ এশিয়া’ নামক এক আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম পর্যটন বাজারের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এই আলোচনায় ক্রিসেন্টরেটিং ও হালাল ট্রিপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফজল বাহারদীন এবং পর্যটন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. উলফগ্যাং জর্জ আরল্ট মূল অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
গত এক দশকে বিশ্বের মুসলিম পর্যটন বাজার ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুসলিম ভ্রমণকারীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি। মহামারির প্রভাব কাটিয়ে উঠে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৭ কোটি ৪০ লাখে। চলতি বছরে এই সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী বছরগুলোতেও এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুসলিম ভ্রমণকারীদের সংখ্যা ২৬ কোটি ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে তাদের মোট ভ্রমণ ব্যয় প্রায় ৩১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মুসলিম পর্যটন আর কোনো বিশেষায়িত বা সীমিত বাজার নয়; এটি বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক পর্যটকের ১১ থেকে ১২ শতাংশের প্রতিনিধিত্বকারী একটি বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নতুন সুযোগ
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বাজারটি পর্যটক সংখ্যা বাড়ানো, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং পর্যটন খাত থেকে আয় বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। সাধারণত বিশ্বের অন্যান্য পর্যটন বাজারের মতো মুসলিম পর্যটকেরা কোনো নির্দিষ্ট দু-একটি দেশে সীমাবদ্ধ নন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাঁরা ভ্রমণ করেন। তবে উৎস দেশ ভিন্ন হলেও তাঁদের অনেক মৌলিক চাহিদা অভিন্ন।
ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তাঁরা হালাল খাবারের সহজলভ্যতা, নামাজ আদায়ের সুবিধা এবং পরিবারবান্ধব পরিবেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। হোটেলের কক্ষে কিবলার দিকনির্দেশনা দেওয়া, কোথায় হালাল খাবার পাওয়া যায়, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য সরবরাহ করা কিংবা প্রার্থনার সুবিধা সম্পর্কে পর্যটকদের জানানো—এ ধরনের সাধারণ উদ্যোগও একটি গন্তব্যকে মুসলিম পর্যটকদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো চাইলে তুলনামূলক সহজ ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম পর্যটকদের জন্য নিজেদের আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও কাঠামোগত মডেল
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এখনো মুসলিম পর্যটন বাজারকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল—সব দেশই গ্লোবাল মুসলিম ট্রাভেল ইনডেক্সে বিভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা ও সুস্পষ্ট অবস্থান নির্ধারণের ঘাটতি রয়েছে।
মুসলিম পর্যটকদের আকর্ষণ করতে বিভিন্ন গন্তব্যকে সহায়তা করার জন্য কয়েকটি কাঠামোগত মডেলও আলোচনায় তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কাঠামো অনুসরণ করলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ধাপে ধাপে মুসলিম পর্যটকদের জন্য নিজেদের আরও প্রস্তুত এবং প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।

