Bangladesh

চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি সেতুর অভাব, দুর্ভোগে ৫০ গ্রামের মানুষ

Foto : Michael Davis - banglajibon.com

মরা নদীর ওপর সেতু না থাকায় ৫০ গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ

Banglajibon.com – চ প ইনব বগঞ জ একট স – চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ও আলাতলী ইউনিয়নের সংযোগস্থলে মরা নদীর ওপর একটি সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ৫০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার দাবি জানানো হলেও আজও সেতু নির্মাণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মরা নদীর ওপর মাত্র ১৩০ মিটারের একটি সেতু না থাকায় মানুষকে কাদাপানির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ কেউই এই দুর্ভোগ থেকে মুক্ত নন। শিক্ষার্থীদের অনেকে বই-খাতা মাথায় তুলে নদী পার হচ্ছে। কেউ পা পিছলে পানিতে পড়ে যাচ্ছে, কেউ ভেজা বই শুকিয়ে আবার পড়তে বসছে। রোগীদের কয়েকজন মিলে কাঁধে তুলে নিয়ে যেতে হচ্ছে। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সও এই পথ ব্যবহার করতে পারে না। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর শেষযাত্রাও সহজ নয়। স্বজনদের কাঁধে খাটিয়া তুলে হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে কবরস্থানে পৌঁছাতে হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা

স্থানীয় বাসিন্দা দলিল লেখক তাজামুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে এই কষ্ট করছি। রোগী, প্রসূতি মা—সবার জন্য এই পথ যেন মৃত্যুফাঁদ। চলতি বছর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনজন গর্ভবতী নারীসহ স্ট্রোক ও সাপে কাটা রোগী মারা গেছে। তাদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরি হওয়ায় মারা গেছে। একটি সেতু থাকলে হতো তাঁদের জীবন বাঁচানো যেত।’ তাজামুল ইসলাম আরও বলেন, ‘মৃত ব্যক্তিকে দাফন করতেও একই ভোগান্তি। পানি পেরিয়ে কাঁধে করে লাশ নিয়ে যেতে হয়। এমন কষ্ট আর কোথাও আছে কি না, জানি না।’

পল্লিচিকিৎসক আবুল কাশেমের কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘২০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা একই দাবি জানিয়ে আসছি। মানববন্ধন করেছি, স্মারকলিপি দিয়েছি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গিয়েছি। নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা এসে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচন শেষ হলে আর কেউ ফিরে তাকান না।’ আবুল কাশেম বলেন, ‘আমাদের এখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা আছে। কিন্তু কলেজ, হাসপাতাল—সব নদীর ওপারে। একটি সেতুর অভাবে পুরো এলাকা উন্নয়নের বাইরে পড়ে আছে।’

শিক্ষার্থীদের কষ্ট ও সরকারি পরিকল্পনা

স্কুলশিক্ষার্থী শামীম রেজা বলে, ‘বর্ষা এলে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। বই-খাতা নিয়ে পানি পার হতে হয়। অনেক সময় পিছলে পড়ে বই নষ্ট হয়ে যায়। নতুন বই পাওয়া যায় না। তখন পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। মরা নদীর এপারে ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ছয়টি মাদ্রাসা থাকলেও এপারে কোনো কলেজ নেই। যার কারণে নদীর পানিতে ভিজে প্রতিদিন ৩ কিলোমিটার কাদামাটি ও পানি পার হয়ে কলেজে যেতে হয়।’

রাণীনগর ছয়শতিয়া জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক তাইফুর রহমান বলেন, ‘আলাতলী, দেবীনগর ও শাহজাহানপুর ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রামের মানুষ এই পথ ব্যবহার করে। শিক্ষক হিসেবে আমরাও প্রতিদিন একই দুর্ভোগ পোহাই। জন্মের পর থেকে এই রাস্তার একই অবস্থা দেখে আসছি। একটি সেতু নির্মাণ করা হলে শুধু যাতায়াতই সহজ হবে না, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হারও কমবে।’

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ওই স্থানে একটি সংযোগ সড়কসহ আধুনিক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি ইতিমধ্যে ডিপিপির (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুততম সম্ভবের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

Leave a Comment