চলছে বালু লুটের মহোৎসব
Table of Contents
সুনামগঞ্জের নদীগুলোতে অবৈধ বালু উত্তোলন, ঝুঁকিতে জনপদ ও পরিবেশ
Banglajibon.com – চলছ ব ল ল ট র মহ – সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ধোপাজান ও মরাচেলা নদীতে অবৈধভাবে বালু তোলার অভিযোগ থামছে না। প্রশাসনিক অভিযান, মামলা এবং আদালতের নির্দেশনা থাকলেও নদীর বুক ও পাড় কেটে বালু সরানোর কাজ চলমান বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে বদলে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গঠন, ক্ষয়ের আশঙ্কায় পড়ছে বসতভিটা, কৃষিজমি, সড়ক ও আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বালু তোলার কাজে মাঠপর্যায়ের শ্রমিকদের দেখা গেলেও এর পেছনে থাকা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কমই দেখা যায়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও শক্তিশালী চক্রের প্রভাব থাকায় অভিযোগকারীরা নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির আশঙ্কার কথাও বলছেন। বারবার প্রতিবাদ হলেও কয়েক দিনের বিরতির পর একই স্থানে আবারও বালু উত্তোলন শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মরাচেলা নদীতে পাড় কেটে বালু তোলা
সম্প্রতি দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী মরাচেলা নদীর পূর্ব সোনাপুর এলাকায় গিয়ে নদীতীর কেটে নৌকায় বালু তোলার দৃশ্য দেখা গেছে। নিজেদের জমির সীমানা রক্ষায় কয়েকজন বাসিন্দা বাধা দিলেও বালু উত্তোলনকারীরা তা মানছেন না বলে অভিযোগ ওঠে।
নদীর ক্ষতিগ্রস্ত তীরের পাশে ছাতা নিয়ে ঘুরছিলেন পূর্ব সোনাপুর গ্রামের আমির হামজা। তিনি জানান, নিজের সীমানার অংশ রক্ষার জন্য তাঁকে নদীতীর পাহারা দিতে হচ্ছে। শ্রমিকদের বালু না তুলতে তিনি একাধিকবার সতর্কও করেছেন।
“এই গ্রামের ছিদ্দিক মিয়া, তার ভাই-ভাতিজারা এইডা নিয়ন্ত্রণ করতাছে। সঙ্গে বাইরের আরও ২০-৩০ জন আছে। বাধা দিলেও মানে না। তারা আমিসহ আমার ভাইরে মারধর কইরা হাসপাতালে পাঠাইছে।”
একই গ্রামের বালুশ্রমিক আসগর আলীও আমির হামজার অভিযোগের সঙ্গে একমত হন। তাঁর দাবি, কয়েকজন ব্যক্তি জোরপূর্বক অন্যের জায়গার তীর কাটছেন এবং বাধা দেওয়ায় দুই ভাইকে মারধর করা হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নদীভাঙন বাড়লে বাড়িঘর টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
“ছিদ্দিক, হামিদ, কাদির, মুরছালিন, আব্দুর রহমানরা জোর কইরা এরার জায়গা খাইতাছে। বাধা দেওয়ায় তারা দুই ভাইরে মারছে। এদের সঙ্গে ছাতক, কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বড় বড় মানুষ আছে। আমরা চাই না, আমরার বাড়িঘর ভাঙুক।”
আসগর আলী বলেন, কয়েক দিন আগে স্থানীয় লোকজন মানববন্ধন করলে শ্রমিকেরা নৌকা নিয়ে সরে যায়। কিন্তু পরদিনই আবার নদীর তীর কেটে বালু তোলার কাজ শুরু হয়। তাঁর অভিযোগ, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে হামলা ও মামলার ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
মানববন্ধনের পর মামলা
দোয়ারাবাজারের নরসিংপুর ইউনিয়নের কাজিরগাঁও এলাকায় গত ৪ অক্টোবর মরাচেলা নদী রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এর দুই দিন পর, ৬ অক্টোবর, নদীর পাড় কেটে অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২৫ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় দিনে মরাচেলা নদী থেকে প্রায় ২৫ লাখ ঘনফুট বালু তোলা হয়। ওই বালুর মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। এর আগেও ধোপাজান ও যাদুকাটা নদীর তীর কেটে শত শত কোটি টাকার বালু উত্তোলনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলা চললেও বাস্তবে বালু তোলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইজারা ও আদালতের নির্দেশনার মধ্যেও অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাদুকাটা নদীর বড় বালুমহালকে ঘিরে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বাড়লে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসে। পরে ইজারার মেয়াদ শেষ হলে জেলা প্রশাসন গত ১৩ সেপ্টেম্বর ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত জানায়।
তবে ২৯ সেপ্টেম্বর আগের এক ইজারাদারের রিট আবেদনের পর আদালত তিন মাসের জন্য বালু উত্তোলন স্থগিত করেন। ফলে যাদুকাটা নদী বর্তমানে ইজারাবিহীন অবস্থায় রয়েছে। তা সত্ত্বেও নদীর আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখানে অবৈধভাবে বালু সরানোর কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজান বালুমহালেও দীর্ঘদিনের পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে। জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের আশঙ্কায় ২০১৮ সালে ধোপাজান কোয়ারি থেকে বালু তোলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেখানে আবার অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। সমালোচনা বাড়লে প্রশাসনিক তৎপরতায় কাজ বন্ধ হলেও গত বছরের অক্টোবরে সরকারি সিদ্ধান্তে পুনরায় বালু উত্তোলন শুরু হয়। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করা হলেও অভিযোগকারীদের মতে, তাতে অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
নদীর গতিপথ বদলালে বাড়ে ভাঙনের ঝুঁকি
নদীর পাড় কেটে বা অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলা হলে তীরের স্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে বর্ষা কিংবা পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে ভাঙন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। নদীঘেঁষা মানুষের জন্য এর অর্থ শুধু জমি হারানোর ভয় নয়; ঘরবাড়ি, যোগাযোগের পথ, ফসলি জমি এবং স্থানীয় অবকাঠামোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা মনে করেন, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এ পরিস্থিতির সমাধান হবে না। তাঁর ভাষায়, নদী রক্ষায় দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
“নদীর পাড় কেটে বালু তোলায় ভূপ্রকৃতি পরিবর্তন ও পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। লোকদেখানো অভিযানের পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না করা গেলে বালু লুট ঠেকানো কঠিন হবে।
“রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া বালু লুটের মতো অপকর্ম সম্ভব না। যখন যে আসে খোলস পাল্টে তার ছায়ায় চলে যায় স্থানীয় বালুখেকোরা। এদের ব্যবহার করে প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা ফায়দা লুটছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে বালু লুট ঠেকানো যাবে না।”
প্রশাসনের বক্তব্য
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান ইজারাবিহীন নদীতে বালু লুটের অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, জেলার চারটি বালুমহালের মধ্যে যাদুকাটা ও মরাচেলা নিয়ে বিশেষ সমস্যা রয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে প্রশাসন নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চালাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কিন্তু নদীতীরবর্তী মানুষ চাইছেন এমন ব্যবস্থা, যাতে অভিযান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লুটপাট আবার শুরু না হয়। তাঁদের প্রত্যাশা, কেবল শ্রমিকদের আটকে না রেখে অবৈধ উত্তোলনের নেপথ্যে থাকা সংগঠক ও সুবিধাভোগীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। নদী, জনপদ ও হাওরাঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় সেই জবাবদিহিই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is চলছ ব ল ল ট র মহ?
চলছ ব ল ল ট র মহ is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does চলছ ব ল ল ট র মহ matter?
চলছ ব ল ল ট র মহ matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
