চট্টগ্রাম বন্দরের সব টার্মিনাল যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে
Table of Contents
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় বিদেশি অপারেটর নিয়ে নতুন বিতর্ক
Banglajibon.com – চট টগ র ম বন দর র – দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের প্রায় সব কনটেইনার টার্মিনাল ধাপে ধাপে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দেওয়ার উদ্যোগকে ঘিরে শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ও আন্দোলনের তৎপরতা বেড়েছে। ইতিমধ্যে তিনটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, আর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার আলোচনা চলছে।
সরকারের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলে আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়বে। বিপরীতে বন্দরসংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতাদের আশঙ্কা, এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।
এনসিটি পরিচালনায় ১৫ বছরের প্রস্তাব অনুমোদন
গত বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের (ওসিওয়াই) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্ব পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরকে দেওয়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত মেয়াদ ১৫ বছর।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্প প্রোফাইলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সরকারের মনোনীত অপারেটর হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কমিটির বৈঠকে সম্ভাব্য কনসেশন চুক্তির খসড়াও উপস্থাপিত হয়।
এনসিটির গুরুত্ব বিশেষভাবে বড়, কারণ ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রধান সমুদ্রবন্দরের কনটেইনার কার্যক্রমে এটি এককভাবে সবচেয়ে বড় টার্মিনাল। ফলে এর ব্যবস্থাপনা কাঠামোর পরিবর্তন বন্দর পরিচালনা, জাহাজজট কমানো, পণ্য খালাসের সময় এবং আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে বিবেচিত হচ্ছে।
আরও তিন টার্মিনাল নিয়ে আগ্রহ
চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি, জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল পরিচালনাতেও বিদেশি অপারেটর যুক্ত করার আলোচনা চলছে। সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) এই তিন স্থাপনা পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে আরএসজিটিআইকে তিন টার্মিনালের অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
বন্দর সচিব সৈয়দ কেফায়েত হামিম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলেন,
“এগুলো যেহেতু সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার, তাই আমি কোনো মন্তব্য করছি না।”
আগেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তিনটি টার্মিনাল
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, লালদিয়ার চর এবং পানগাঁও আইসিডিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর নবনির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য পরিচালনার চুক্তি হয় আরএসজিটিআইয়ের সঙ্গে। টার্মিনালটি ইতিমধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম শুরু করেছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর লালদিয়ার চর ও পানগাঁও টার্মিনালের জন্য একই দিনে দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। লালদিয়ার চর টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং পানগাঁও আইসিডির জন্য নির্বাচিত হয়েছে সুইজারল্যান্ডের মেডলগ।
এপিএম টার্মিনালসকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০৩০ সাল থেকে পরবর্তী ৩০ বছর লালদিয়ার চর টার্মিনাল পরিচালনা করবে; চুক্তির সময়সীমা আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। মোট পরিকল্পনার মেয়াদ ৪৮ বছর মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঢাকার কাছাকাছি কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ লাখ ৬০ হাজার টিইইউতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে মেডলগ সেখানে অবকাঠামো ও সুবিধা সম্প্রসারণ করবে। নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া বলেছেন, পানগাঁও আইসিডি ডিসেম্বর থেকে পূর্ণমাত্রায় অপারেশনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারের যুক্তি ও শ্রমিকদের আপত্তি
নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া বিদেশি অপারেটর নিয়োগকে সরকারের চলমান কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্ত হলে বন্দরে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, সেবার মান উন্নত হবে এবং শ্রমিকেরাও আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পাবেন।
“বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালিত হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে এবং শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পাবে।”
তবে এ যুক্তিতে একমত নন শ্রমিক নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, সক্ষমতা বৃদ্ধি বা দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন থাকলেও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তা করা সম্ভব। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান, কর্মপরিবেশ এবং বন্দরের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলেও তাঁরা মনে করছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকনের আশঙ্কা, বিদেশি অপারেটরদের হাতে টার্মিনাল গেলে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব কমে যাবে।
“বন্দরের টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃত্ব হারাবে। জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত ও দেশীয় কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।”
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহারও এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন,
“বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ হলে বন্দর দেউলিয়া হয়ে যাবে। শ্রমিকেরা চাকরি হারাবে।”
আন্দোলনের কর্মসূচি
এনসিটি ও ওসিওয়াই বিদেশি আন্তর্জাতিক অপারেটরের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদনের পর বন্দর রক্ষা কমিটি নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বন্দর এলাকা, কাস্টমস ও প্রেসক্লাবকে কেন্দ্র করে শ্রমিক-কর্মচারীদের ধারাবাহিক কর্মসূচি চলছে।
কমিটির দাবি, এনসিটি ও ওসিওয়াইয়ের কনসেশন চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে এবং সিসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ রাখতে হবে। তাদের বক্তব্যে বন্দরকে শুধু বাণিজ্যিক স্থাপনা হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবেও দেখা জরুরি।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, জাহাজ থেকে পণ্য নামানো দ্রুত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাড়তি চাপ সামলানো—এসব লক্ষ্য নিয়ে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের পরিকল্পনা এগোচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তদারকি, শ্রমিকের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক প্রভাব নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন বন্দরের ব্যবস্থাপনা প্রশ্নকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is চট টগ র ম বন দর র?
চট টগ র ম বন দর র is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does চট টগ র ম বন দর র matter?
চট টগ র ম বন দর র matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
