কালিহাতীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট: কঠিন বর্জ্য কঠিনই আছে
কালিহাতীতে বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্প আটকে, চার বছরেও শুরু হয়নি সার ও গ্যাস উৎপাদন
Banglajibon.com – ক ল হ ত র বর জ - টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভায় আধুনিক পদ্ধতিতে কঠিন বর্জ্য ও মানববর্জ্য শোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো পূর্ণতা পায়নি। জৈবসার ও বায়োগ্যাস তৈরির লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল আট মাসের মধ্যে। অথচ সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেলেও প্ল্যান্টের মূল অবকাঠামোই সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে প্রতিদিনের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটও বহাল রয়েছে।
প্রায় ১৫ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কালিহাতী পৌরসভায় রয়েছে ৯টি ওয়ার্ড ও ১৮টি মহল্লা। প্রায় ৪২ হাজার মানুষের এই পৌর এলাকায় প্রতিদিন গড়ে দেড় টন কঠিন ও তরল বর্জ্য তৈরি হয়। নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় অনেক স্থানে অপরিকল্পিতভাবে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে উঠছে।
৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার পরিকল্পনা
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পৌর কর্তৃপক্ষ ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের সমন্বিত কঠিন ও মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একই স্থানে বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, শোধন ও পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। পচনশীল বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার এবং প্রক্রিয়াজাত অংশ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের ব্যবস্থাও এতে রাখা হয়েছে।
প্রকল্পে প্ল্যান্টেড ড্রায়িং বেড ও অ্যানেরোবিক ব্যাফেল রিঅ্যাক্টর বা এবিআর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব ইউনিটের কাজ মানববর্জ্যের তরল অংশ শোধন করে ক্ষতিকর উপাদান কমানো। শোধনের পর পানি আরও বিশুদ্ধ করতে কনস্ট্রাক্টেড ওয়েটল্যান্ড ও পলিশিং পন্ড থাকার কথা। শোধিত পানি প্রকৃতিতে ছাড়ার উপযোগী করাই এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতের জন্য কম্পোস্ট শেড ও সর্টিং শেড নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সেখানে আবর্জনা এনে প্রথমে আলাদা করা হবে। লোহালক্কড়, প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, কাঠ এবং কাচের মতো অপচনশীল বস্তু পৃথক করার পর পচনশীল অংশ প্রক্রিয়াজাতে যাবে। শুকনো মানববর্জ্যের সঙ্গে তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে উন্নতমানের উর্বর কম্পোস্ট জৈবসার তৈরির কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ময়লা থেকে বের হওয়া দূষিত তরল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রণে লিচেট ট্যাংক এবং কমবাসশন ইউনিট রাখা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য অফিসকক্ষ, নিরাপত্তাকক্ষ ও পার্কিং শেডসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক স্থাপনাও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত।
কাজ শুরু হলেও শেষের দেখা নেই
ঢাকার ‘টার্ন-এনসি (জেভি)’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২২ সালের ১ মার্চ এই কাজের কার্যাদেশ পায়। চুক্তি অনুযায়ী আট মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত পুরো প্ল্যান্ট চালুর মতো অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
প্ল্যান্ট এলাকায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ হয়েছে। তবে বর্জ্য পোড়ানোর প্রক্রিয়ার প্রধান অংশ হিসেবে বিবেচিত কমবাসশন মেশিন বসানোর জন্য নির্ধারিত শেড এখনো তৈরি হয়নি। ফলে শুধু স্থাপনা আংশিকভাবে দৃশ্যমান হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর সুবিধা পাচ্ছেন না পৌরবাসী।
প্রকৌশল-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্ল্যান্টটি পুরোপুরি চালু করা গেলে এটি এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠতে পারে। কারণ পৌর এলাকার বর্জ্য এক জায়গায় এনে সুশৃঙ্খলভাবে বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আবর্জনাকে ফেলে রাখার বদলে ব্যবহারযোগ্য সার ও গ্যাসে রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জমি, জলাবদ্ধতা ও স্থানীয় জটিলতায় বিলম্ব
প্রকল্পের ঠিকাদার নূরে আলম টিটু নির্মাণকাজ পিছিয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত আইনি জটিলতা, এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঘটনা, নিচু জমিতে মাটি ভরাটের সমস্যা এবং দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকায় কাজ স্বাভাবিক গতিতে এগোয়নি।
“জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছু আইনি জটিলতা, স্থানীয় এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নিচু এলাকা হওয়াতে মাটি ভরাটে সমস্যা এবং দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে নির্মাণকাজ অনেকখানি পিছিয়ে গেছে।”
নিচু এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণে ভূমি উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা থাকলে নির্মাণসামগ্রী আনা, ভিত্তির কাজ এবং যন্ত্রপাতি স্থাপনের সময়সূচি ব্যাহত হতে পারে। তবে প্রকল্পের দীর্ঘ বিলম্বের কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর প্রশ্নও সামনে এসেছে।
কমবাসশন মেশিন আমদানিও অনিশ্চিত
প্ল্যান্টটির কার্যক্রমে কমবাসশন মেশিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্য পোড়ানোর এই যন্ত্র সরবরাহের জন্য ২০২৪ সালে ‘লাবণী-কেএইচটি (জেভি)’ নামের আরেকটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৪ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তিতে এক বছরের মধ্যে মেশিন সরবরাহের কথা থাকলেও যন্ত্রটি এখনো পৌঁছেনি।
ঠিকাদার সাদেকুল ইসলাম কাঞ্চন জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে ব্যাংক এলসি বা ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সেই সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ে মেশিন আমদানি করা যায়নি।
“গত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে ব্যাংক এলসি খোলার ক্ষেত্রে জটিলতা ছিল। এই এলসি সমস্যার কারণে যথাসময়ে মেশিনটি আনা সম্ভব হয়নি।”
মেশিন না আসা এবং শেড নির্মাণ শেষ না হওয়ায় প্ল্যান্টের নির্ধারিত প্রক্রিয়াগুলো একসঙ্গে চালুর পথও বন্ধ রয়েছে। একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে সংগ্রহ, বাছাই, শোধন ও অবশিষ্ট বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি ধাপ পরস্পর নির্ভরশীল। তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট অসম্পূর্ণ থাকলে পুরো ব্যবস্থার সুফল পাওয়া কঠিন হয়।
দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ
কালিহাতী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার জানিয়েছেন, প্রকল্পটি শেষ করার জন্য ঠিকাদার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নানা জটিলতায় এখনো প্ল্যান্ট চালু করা সম্ভব হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
“কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নানাবিধ কারণে এটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।”
পৌর এলাকার প্রতিদিনের বর্জ্য কোথায় এবং কীভাবে ফেলা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নির্দিষ্ট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থা কার্যকর না হলে খোলা জায়গা, রাস্তার পাশ কিংবা অনুপযুক্ত স্থানে আবর্জনা জমার ঝুঁকি থাকে। পরিকল্পিত প্ল্যান্ট চালু হলে সেই চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবে রূপ নিতে হলে অসমাপ্ত অবকাঠামো, কমবাসশন শেড এবং যন্ত্র সরবরাহ—সব কাজ দ্রুত সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কালিহাতীর বর্জ্যকে সার ও গ্যাসে পরিণত করার যে সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল, তা এখনো অপেক্ষায় আছে প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়নের।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ক ল হ ত র বর জ?ক ল হ ত র বর জ is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ক ল হ ত র বর জ matter?ক ল হ ত র বর জ matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.