অধস্তন আদালত: মামলা বাড়লেও বাড়েনি বিচারক
বিচারক সংকট ও মামলা জট: অধস্তন আদালতের বর্তমান চিত্র
Banglajibon.com – অধস তন আদ লত - দেশের প্রতিটি অধস্তন আদালতে বর্তমানে মোট ২ হাজার ২৩৭ জন বিচারক কর্মরত আছেন। তবে তাঁদের মধ্যে প্রায় চার শতাধিক বিচারক বিভিন্ন কারণে—যেমন প্রেষণ, মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তি, শিক্ষা ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি—পুরো বছর ধরে আদালতের কাজ থেকে দূরে থাকেন। ফলে সারা দেশে মাত্র ১ হাজার ৮৩৭ জন বিচারক নিয়মিত বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। জনসংখ্যার হিসেবে এই সংখ্যাটি খুবই কম, কারণ প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক পড়েন।
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪৮ লাখ মামলা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে জেলা আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে মোট ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ১২১টি মামলা চলমান ছিল। অর্থাৎ, গত দুই দশকে মামলার সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ বেড়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা ও মামলার সংখ্যা বাড়লেও বিচারকের সংখ্যা সেই তুলনায় বাড়েনি।
বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি একমাত্র সমাধান নয়, তবে বর্তমান সংখ্যাটিও অপ্রতুল বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, দক্ষ বিচারকের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত। আইন কমিশন ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৫ সালের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা ৫ হাজারে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ বছর পার হওয়ার পরও সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যাও অপর্যাপ্ত। তাই মামলাজটের কথা বিবেচনায় নিয়ে অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার হওয়া উচিত বলে মনে করেন আইনজীবী ও বিচারকরা।
বর্তমানে মামলার যে জট, তা নিষ্পত্তি করতে অধস্তন আদালতে অন্তত ১০ হাজার বিচারক প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সহায়ক জনবল, প্রয়োজনীয় অফিস সরঞ্জাম এবং এজলাস। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকেও জোর দিতে হবে। তাহলেই মামলাজট কমবে।
অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহজাহান সাজু এই বিষয়ে বলেন, বর্তমান মামলার জট নিষ্পত্তির জন্য অধস্তন আদালতে অন্তত ১০ হাজার বিচারক প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সহায়ক জনবল, অফিস সরঞ্জাম ও এজলাসের প্রয়োজন। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে জোর দিলে মামলাজট কমানো সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক তুলনা ও প্রস্তাবনা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগের নানা সংস্কার নিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। ২০২৪ সালে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনকে দেওয়া ওই প্রস্তাবে বলা হয়, জনসংখ্যার হিসেবে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে বিচারক একজন। ডেনমার্কে ১৫ হাজারের বিপরীতে ১ জন, জাপানে ৫৭ হাজারের জন্য ১ জন, পাকিস্তানে ৫০ হাজারের জন্য ১ জন এবং ভারতে ৪৭ হাজারের বিপরীতে ১ জন বিচারক থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
প্রায় ৪০০ বিচারককে নানা কারণে বিচারকাজের বাইরে থাকতে হয়। আর একজন বিচারকের বিপরীতে ৫০০ মামলা থাকলে সহজে নিষ্পত্তি করা যায়। বর্তমানে গড়ে ৩ হাজারের বেশি মামলা। এ কারণে ঠিকভাবে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।
জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রায় ৪০০ বিচারক বিভিন্ন কারণে বিচারকাজের বাইরে থাকেন। একজন বিচারকের বিপরীতে ৫০০ মামলা থাকলে সহজে নিষ্পত্তি করা যায়। কিন্তু বর্তমানে গড়ে ৩ হাজারের বেশি মামলা রয়েছে, তাই ঠিকভাবে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা ১০ হাজার হওয়া উচিত। শুধু বিচারক বাড়ালেই মামলাজট শিগগির কমবে না; বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে মামলার আগে প্রি-মেডিয়েশন করতে হবে।
বিচারকদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা
বিচারক সংকটের কারণে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একজন বিচারককে অনেক মামলার বিচার নিষ্পত্তি করতে হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারকরা সিভিল আপিল, সিভিল রিভিশন, ক্রিমিনাল আপিল, ক্রিমিনাল রিভিশন, ক্রিমিনাল মিস, দুদক, আরবিট্রেশন, মাদক, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলা, সাধারণ দায়রা মামলা, মোবাইল কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারার অধীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেওয়া কার্যধারার বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদনের নিষ্পত্তি করেন। অতিরিক্ত জেলা জজের পৃথক কোনো ক্ষমতা নেই। তাঁরা জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারকের সমান ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তবে তাঁদের দায়িত্ব জেলা জজ নির্ধারণ করে দেন।
যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারকরা ২৫ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে সব ধরনের দেওয়ানি মামলা, সিভিল আপিল, মাদক, ১০ বছর পর্যন্ত সাজার সব মামলা, বিশেষ আদালতে ১০ বছরের বেশি সাজার মামলা, এনআই অ্যাক্ট, অর্থঋণ, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ আরও কিছু মামলার শুনানি করেন। সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ আদালতের বিচারকরা প্রায় ২৫ ধরনের মামলার শুনানি করেন।
সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মো. মাজহারুল হক বলেন, বর্তমানে অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা দেশের জনসংখ্যা ও মামলার অনুপাতে অপর্যাপ্ত। এ কারণে একজন বিচারককে প্রতিদিন অনেক বেশি মামলা পরিচালনা ও নিষ্পত্তি করতে হয়। ফলে গুণগত মানসম্পন্ন বিচার নিশ্চিত করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, বিচারসংশ্লিষ্ট কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ সহায়ক জনবল ও সরঞ্জামাদির প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারক, দক্ষ সহায়ক জনবল ও সরঞ্জামাদির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ আরও বাড়বে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is অধস তন আদ লত?অধস তন আদ লত is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does অধস তন আদ লত matter?অধস তন আদ লত matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.