সংসদ অধিবেশন: উত্তাপ ও অচলাবস্থায় ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা
Table of Contents
উত্তাপ, ওয়াকআউট ও অচলাবস্থায় শেষ হলো ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশন
Banglajibon.com – স সদ অধ ব শন – ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন মাত্র ৯ কার্যদিবস চললেও এর রাজনৈতিক আবহ ছিল বেশ টানটান। সরকার ও বিরোধী দলের তর্ক-বিতর্ক, একাধিক ওয়াকআউট, কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ এবং বক্তব্য ঘিরে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা এই অধিবেশনকে আলাদা করে তুলেছে। অধিবেশনের শেষ পর্যন্ত সংসদে সহযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় ২৭ আগস্ট অধিবেশন শুরু হয় এবং সাপ্তাহিক চার দিনের ছুটি ও দুই দিনের বিরতি শেষে ১০ সেপ্টেম্বর সমাপ্তি ঘটে। এই সময়ে ছয়টি বিল অনুমোদিত হয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বিদেশে অবস্থানরত পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও সাধারণ আলোচনা হয়।
তবে আইন প্রণয়ন ও আলোচনার পাশাপাশি রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্র হিসেবেই অধিবেশনটি বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিরোধী সদস্যদের অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সরকার তাদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারি দলের বক্তব্য, প্রচলিত সংসদীয় বিধান ও রীতির মধ্যেই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
প্রথম দিনেই বাকবিতণ্ডা ও কার্যক্রমে বিঘ্ন
অধিবেশনের উদ্বোধনী দিন প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র হয়। বিরোধী দলের দুই সদস্যের প্রশ্নের সঙ্গে তিনি শাহবাগ স্কয়ার ও পল্টনের বক্তব্যের তুলনা করেন। এ নিয়ে বিরোধী সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানালে সংসদকক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামলাতে একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং পরে নিজের বক্তব্য ফিরিয়ে নেন। কিন্তু তাতেও তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা কমেনি; প্রায় ১০ মিনিট সংসদের কার্যক্রম স্থবির ছিল। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বিরোধী দলকে খাটো করা হয়েছে। তিনি ঘটনাটিকে ‘সংসদীয় ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
“যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ করেছি, তা সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়। আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।”
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই মন্তব্য সংসদীয় পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগকে সামনে আনে। সংসদে মতভেদ স্বাভাবিক হলেও, বিতর্ক যদি বারবার আলোচনার পথ রুদ্ধ করে, তাহলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর পর্যালোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিল ঘিরে বিরোধীদের একাধিক ওয়াকআউট
দ্বিতীয় কার্যদিবসে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের প্রতিবাদে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। তাঁদের অভিযোগ ছিল, সংস্কারের নামে সীমিত পরিবর্তন এনে সরকার একতরফাভাবে সংসদ চালাচ্ছে। পরে বিল দুটি পাসের দিনেও তাঁরা ওয়াকআউট করেন। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির বৈঠক থেকেও বিরোধী সদস্যদের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
দুই বিল অনুমোদনের প্রতিবাদে বিরোধী সদস্যরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদকক্ষ ত্যাগ করেন। এ ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ তাঁদের রাজনৈতিক আপত্তিকে দৃশ্যমান করলেও, বিলের ধারা ও সংশোধনী নিয়ে সরাসরি আলোচনায় বিরোধী মতামত কতটা প্রতিফলিত হলো, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল নিয়েও বিরোধী দলের আপত্তি ছিল প্রবল। তাঁরা বিলটিকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী বলে অভিহিত করেন। পাসের প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা কিছু সময়ের জন্য কক্ষ ত্যাগ করলেও পরে ফিরে এসে সংশোধনী আলোচনায় অংশ নেন। অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে শফিকুর রহমান বিলটি নতুন করে বিবেচনার অনুরোধ জানান। তাঁর ভাষ্য, আইনটি সমাজে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে; তাই রাষ্ট্রপতির কাছে এতে স্বাক্ষর না করার আবেদনও জানান তিনি।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মত হলো, বিলটি পাসের আগে কমিটির মাধ্যমে জনমত যাচাইয়ের সুযোগ রাখা যেত। তাঁর পর্যবেক্ষণে, সরকারের উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব নিয়ে দীর্ঘ বিরোধ
তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যে নিয়মগত প্রয়োজনেই ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এসব কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অন্তত চার দফা তীব্র বিতর্ক হয়। সংসদীয় কমিটিগুলো আইন, মন্ত্রণালয়ের কাজ ও নীতিগত বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হওয়ায় সভাপতিত্বের প্রশ্নটি রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়।
৩০ আগস্ট দ্বিতীয় কার্যদিবসে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জুলাই জাতীয় সনদের কথা উল্লেখ করে দাবি জানান, সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২৬ শতাংশ সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দিতে হবে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত বিধান বা রেওয়াজে বিরোধী দলের জন্য কমিটির সভাপতিত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটিতে অংশ নিলে তাদের প্রত্যাশিত অনুপাতে সভাপতির পদ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়।
বিরোধী দল এই প্রস্তাব মানেনি। তাদের বক্তব্য, দুটি পৃথক বিষয়কে শর্তসাপেক্ষে যুক্ত করা সমীচীন নয়। তারা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নীতিগতভাবে না যাওয়ার অবস্থান বজায় রাখলেও আনুপাতিক হারে স্থায়ী কমিটির নেতৃত্বে নিজেদের অধিকার দাবি করে। পরের তিন কার্যদিবসেও এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চলে।
শেষ পর্যন্ত সরকারি দল ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি গঠন করে, যেখানে বিরোধী দলের হাতে কোনো সভাপতির পদ যায়নি। সংসদ-সম্পর্কিত আরও ১১টি বিষয়ভিত্তিক কমিটিও গঠিত হয়। ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দলের সভাপতিত্বে রয়েছে কেবল একটি কমিটি, যা আগের অধিবেশনেই গঠিত হয়েছিল।
নতুন বাহিনী গঠনের বিল ও ভবিষ্যৎ সংসদ নিয়ে প্রশ্ন
অধিবেশনের শেষ দিনে র্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি গঠনের বিল পাস হয়। বিরোধী দলের অভিযোগ, র্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি এবং দায়দায়িত্ব সরাসরি এসআরবির কাছে স্থানান্তরিত হবে। তাদের দৃষ্টিতে, এতে কাঠামোগত পরিবর্তনের বদলে কেবল নাম বদলের আশঙ্কা রয়েছে।
অধিবেশনে একজন স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ করে আপত্তিকর ও অশালীন মন্তব্যের ঘটনাও আলোচিত হয়। সংসদে ভাষা ও আচরণের মান নিয়ে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করে, কারণ প্রতিনিধিদের পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকাই কার্যকর বিতর্কের অন্যতম শর্ত।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, এই অধিবেশনে দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট মেরুকরণ দেখা গেছে, যা সংসদীয় রাজনীতির জন্য অনুকূল নয়। তাঁর আশঙ্কা, তৃতীয় অধিবেশনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ অধিবেশনগুলোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে দেশের বড় ইস্যুতে বিস্তারিত, নিয়মতান্ত্রিক ও ফলপ্রসূ বিতর্ক সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
সংসদ শুধু বিল পাসের জায়গা নয়; এটি সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিরোধী মতকে শোনা এবং জাতীয় সংকট নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনার ক্ষেত্রও। তৃতীয় অধিবেশনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সেই ভূমিকা শক্তিশালী করতে হলে উভয় পক্ষকেই বক্তব্যের ভাষা, আলোচনার সুযোগ এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক সহনশীলতার বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is স সদ অধ ব শন?
স সদ অধ ব শন is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does স সদ অধ ব শন matter?
স সদ অধ ব শন matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
